কিরূপে বৌদ্ধ ধর্মগ্রন্থে পরিত্রাণসূত্রের উদ্ভব হইয়াছে এবং লৌকিক বৌদ্ধধর্মে ইহার বিশেষত্ব কি তাহা সবিস্তার আলোচনা করিবার স্থান ইহা নহে। সংক্ষেপে বলিতে গেলে, পরিত্রাণসূত্রগুলি বস্তুত দেবারাধনা, ত্রিরত্ন বন্দনা, বুদ্ধের নাম-সংকীর্তন, পাপখ্যাপন, স্বস্তিবচন ও সত্যক্রিয়া।
ড. বেণীমাধব বড়ুয়া:
পরিত্রাণ পাঠের প্রারম্ভে পৃথিবীস্থ, সুমেরু ও অন্তরীক্ষবাসী, ব্যোম-বিহারী, সংক্ষেপে দশসংহস্রচক্রবালবাসী বৌদ্ধ ধর্মানুরাগী দেবতাগণকে নির্দিষ্টস্থানে সমাগত হইয়া সদ্ধর্মশ্রবণ, ধর্ম-সভা ও ধর্মোৎসবে রক্ষণাবেক্ষণ, মনুষ্যজাতির প্রতি মৈত্রীভাবপোষণ ও করুণা বিতরণের জন্য সাদরে আহ্বান করা হয়। সদ্ধর্ম-শ্রবণ ব্যাপারে দেবতা ও মনুষ্যগণের একত্র সমাগত হয় বলিয়া পরিত্রাণসূত্রগুলি সমাগম নামেও অভিহিত হইয়া থাকে। নানাবিধ ভয়, নানাবিধ দুঃখ, অশান্তি ও উপদ্রব নিবারণ ও সর্ববিধ মঙ্গল-বিধানের জন্য পরিত্রাণসূত্রগুলি পঠিত হয়। পরিত্ত বা রক্ষামন্ত্র নামের ইহাই বিশেষত্ব। প্রায় প্রত্যেক পরিত্রাণসূত্রে ত্রিরতে�র শরণ-গমন, বন্দনা, স্তুতি ও মাহাত্ম্য বর্ণনা আছে। প্রায় প্রত্যেক পরিত্রাণসূত্রে বুদ্ধের নাম-সংকীর্তন করা হইয়াছে। কতিপয় সূত্রে পরিত্রাণ পাঠক ত্রিরতে�র নিকট জ্ঞানকৃত ও অজ্ঞানকৃত পাপ ও ত্র�টির জন্য ক্ষমা প্রার্থনা করেন। প্রত্যেক সূত্রেই পরিত্রাণ পাঠক সত্যবাক্যের দোহাই দিয়া নিজের কিংবা অপরের কিংবা সকলের মঙ্গল ও জীবন সংগ্রামে জয় কামনা করেন। ইহা হইতে সহজে অনুমিত হইতে পারে যে পরিত্রাণসূত্রগুলি লৌকিক বৌদ্ধধর্মে একপ্রকার দেববাদ, মন্ত্রবাদ, ও নামবাদ সূচনা করেন। ফল কথা, পরিত্রাণ-সূত্রগুলি মন্ত্রযান বৌদ্ধধর্মেরই অঙ্গ বিশেষ। মূল বৌদ্ধধর্মের সহিত ইহাদের বিশেষ কোনও সম্পর্ক বা সঙ্গতি নাই, থাকিতে পারে না। আমার বিশ্বাস এই যে, যখন কালক্রমে বৌদ্ধ গৃহস্থ-সমাজ গঠিত হয় সেই সময় হইতেই প্রচলিত
হিন্দু বা আর্য গৃহ্যমন্ত্রের অনুকরণে পালি ও মিশ্রিত ভাষায় বৌদ্ধ পরিত্রাণসূত্রের রচনা আরম্ভ হয়। পরিত্রাণসূত্রগুলি যে প্রাচীন বৈদিক মন্ত্রের অনুকরণ বা রূপান্তর ইহা কিছুতেই অস্বীকার করা যায় না। দৃষ্টান্তস্থলে, খন্ধ-পরিত্ত বা চন্দ-পরিত্রাণ মূলতঃ একটি সাপের মন্ত্র। ঋগে�দের অগস্ত্য-সূত্র বৈদিক সর্পমন্ত্রের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। মোর-পরিত্ত বা ময়ূর-পরিত্রাণ বস্তুত একটি সুর্যোপাসনা মাত্র-
অপেতা�য়ং চক্খুমা একরাজা
হরিস্সবণে�া পঠবিপ্পভাসো।
তং তং নমস্সামি হরিস্সবণ�ং পঠবিপ্পভাসং তয়জ্জগুত্তা বিহরেমু রত্তিং ॥
-অস্তমিত রবি এবে, ভুবনের চক্ষুষ্মান রাজা,
এক অধীশ্বর,
সোণার বরণ ভাতি, হিরন্ময় দীপ্তিমান্ ত্রাতা,
ভুবন-ভাস্কর।
নমি আমি, নমি সেই হিরন্ময় ভুবন-ভাস্করে।
গুপ্ত মহিমায় তাঁরি, যাপিব হে নিশা আজি,
নির্ভয় অন্তরে।
চন্দ-পরিত্ত এবং সুরিয়-পরিত্ত সম্বন্ধেও উক্ত সিদ্ধান্ত সত্য। ধজগ্গ-পরিত্ত বা ধ্বজাগ্রপরিত্রাণ মূলতঃ ধূমকেতু বিষয়ক রচনা এবং বস্তুত একটি অগ্নিউপাসনা। প্রাচীন বৌদ্ধ পরিত্তের অনুরূপ সংস্কৃত পরিত্রাণ বা রক্ষামন্ত্র মহাভারতে প্রচুর দৃষ্ট হয়। বলা নিষ্প্রয়োজন যে পালি আটানাটিয় সুত্তের অনুরূপ সংস্কৃত সূত্রই প্রকৃত প্রস্তাবে পাণিনির পূর্ববর্তী মহাভারতের প্রথম পরিচ্ছেদ। সর্পযজ্ঞের সহিত এই সূত্রের প্রকৃত সম্বন্ধ। অর্থবেদই লৌকিক ও বৈদিক মন্ত্রের বিশাল ভাণ্ডার। যে দিন হইতে মনুষ্যজাতির মধ্যে বাক্শক্তি উন্মেষ হইয়াছে, সে দিন হইতেই মন্ত্ররচনা ও মন্ত্রপাঠ আরম্ভ হইয়াছে। অতএব ইহা স্বতঃসিদ্ধ যে মন্ত্ররচনা ও মন্ত্রপাঠ ঋগে�দ সংহিতা অপেক্ষা প্রাচীন। বৈদিকমন্ত্রের বিশেষত্ব এই যে পূর্বতন লৌকিক মন্ত্রগুলি ঋগে�দের উচ্চতর ভাব ও ভাষার মহিমায় মহিমান্বিত হইয়াছে।
আমার বিশ্বাস, আমার দৃঢ় বিশ্বাস এই যে, বৌদ্ধ সাহিত্যে পরিত্রাণসূত্রের উদ্ভব ও সমাবেশ বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের পরবর্তী, অন্যূন একশত বৎসর পরবর্তী। মিলিন্দ-প্রশ্নে যে সকল সূত্র স্পষ্টতঃ পরিত্রাণ নামে অভিহিত হইয়াছে উহাদের একটিও বুদ্ধের মহাপরিনির্বাণের একশত বৎসরের পূর্ববর্তী বৌদ্ধগ্রন্থে দেখিতে পাওয়া যায় না। মিলিন্দ-প্রশ্নের তালিকায় নিুলিখিত পরিত্তগুলির উল্লেখ আছে যথাঃ
রতন-সূত্ত�ইহা সুত্ত-নিপাত, খুদ্দক-পাঠ ও মহাবস্তু গ্রন্থে সন্নিবেশিত আছে। তন্মধ্যে সুত্ত-নিপাতের সঙ্কলনকাল প্রায় অশোকের সমসাময়িক খুদ্দকপাঠের সঙ্কলনকাল অশোকের পরবর্তী এবং মহাবস্তুর সঙ্কলনকাল খ্রীষ্টিয় ১ম কিংবা ২য় শতাব্দী।
ঋদ্দি-পরিত্ত�ইহা বিনয়ের চুল্লবগ্গে সন্নিবেশিত আছে। জাতকগ্রন্থে ইহা খন্ধবত্ত জাতক নামে প্রসিদ্ধ। বর্তমান চুল্লব� রচনার সমাপ্তিকাল বুদ্ধের পরিনির্বাণের অন্ততঃ একশত বৎসর পরবর্তী। প্রমাণ�তন্মধ্যে দ্বিতীয় বৌদ্ধ সঙ্গীতির বিবরণ আছে। কিংবদন্তী অনুসারে এই সঙ্গীতি বুদ্ধের পরিনির্বাণের ঠিক এক শতাব্দী পরে আহূত হইয়াছিল। জাতকগ্রন্থের রচনাকালও বুদ্ধের দেহত্যাগের একশত বৎসর পরবর্তী।
মোর-পরিত্ত�ইহা জাতকগ্রন্থে মহামোর জাতক নামে অভিহিত।
ধজগ্গ-পরিত্ত � ইহা সংযুক্ত-নিকায়ে দৃষ্ট হয়।
আটানাটিয়-পরিত্ত � ইহার এক সংস্করণ দীঘ-নিকায়ের তৃতীয় ভাগে আটানাটিয় সুত্তন্ত এবং অন্য সংস্করণ অন্যত্র আটানাটিয় সুত্ত নামে সুপরিচিত। সংস্করণদ্বয় অনেকাংশে পরস্পর হইতে বিভিন্ন।
আঙ্গুলিমাল-পরিত্ত� ইহা মজ্ঝিম-নিকায়ে অঙ্গুলিমাল সুত্ত এবং থের-গাথায় অঙ্গুলিমালগাথা নামে অভিহিত। বস্তুত অঙ্গুলিমাল স্থবিরের যে উক্তি পরিত্রাণ নামে সুপরিচিত তাহা উল্লিখিত সূত্র কিংবা গাথার অন্তর্গত নহে-
যতো�হং ভগিনি অরিয়ায় জাতিয়া জাতো।
নাভিজানামি সঞ্চিচ্চ পানং জীবিতা বোরোপেতা।।
তেন সচ্চেন সোত্থি তে হোতু সোত্থি গ্ভস্স।
�যদবধি হে ভগিনি জনম লভেছি
আর্যকুলে, নাহি জানি করিয়াছি কভু
প্রাণীর জীবন নাশ, স্বেচ্ছায় সজ্ঞানে।
এ সত্য প্রভাবে হউক মঙ্গল তোমার,
মঙ্গল গর্ভের তব, হক্ সুপ্রসব।
ত্রিপিটকের অন্তর্ভুক্ত যে সকল সূত্রকে আভ্যন্তরীণ প্রমাণে গুপ্তি, রক্ষা অথবা পরিত্রাণ নামে অভিহিত করা যাইতে পারে উহারা সংখ্যায় অতি অল্প। উপরে মিলিন্দ-প্রশ্ন হইতে উহাদের তালিকা উদ্ধৃত হইয়াছে। পাঠক লক্ষ্য করিয়া থাকিবেন যে উহাদের একটিও বিবাহমন্ত্ররূপে পঠিত হইত না। বিশেষতঃ ঐ সকল সূত্র হইতে কোন আভাষ পাওয়া যায় না যে প্রাচীন বৌদ্ধমন্ত্র পাঠের সহিত কোন প্রকার বাহ্যপ্রক্রিয়া যুক্ত ছিল কিনা। ত্রিপিটকের প্রমাণে শুধু বলা যাইতে পারে যে কতকগুলি সূত্র সুরযোগে এবং অপর কতকগুলি সূত্র মনে মনে আবৃত্তি করা হইত। ভিক্ষুদের মধ্যে এই প্রাচীন প্রথা আবহমান কাল অক্ষুণ�ভাবে বিদ্যমান আছে। তাঁহাদের মন্ত্রপাঠের সহিত কোন বাহ্যপ্রক্রিয়ার সংযোগ নাই। রাখী-বন্ধন, মন্ত্র-পাঠকের আসন, ধৌত জলপান, মন্ত্রপুত জলপানের সাহায্যে পেটকামড়ানী নিবারণ ও সুপ্রসবের চেষ্টা, বাস্তু-ভিটা প্রদক্ষিণ করিতে করিতে ভিক্ষা পাত্র হইতে সর্বত্র মন্ত্র-পুত জল-সিঞ্চন, আগুন নিবাইবার জন্য ধুল-পড়ার ব্যবস্থা ইত্যাদি বাহ্যপ্রক্রিয়ার উল্লেখ অর্থকথা ও অন্যান্য পরবর্তী বৌদ্ধ গ্রন্থসমূহে দৃষ্ট হয়। এ সকল প্রক্রিয়ার সহিত লৌকিক বৌদ্ধধর্মেরই সম্বন্ধ আছে। মিলিন্দ-প্রশ্নের ন্যায় ত্রিপিটকের বহির্ভূত বৌদ্ধগ্রন্থের প্রমাণের উপর নির্ভর করিয়া নির্বিবাদে বলা যাইতে পারে যে পরবর্তীকালে বৌদ্ধ সাহিত্যে পরিত্রাণের সংখ্যা উত্তরোত্তর বর্দ্ধিত হইয়াছে। ত্রিপিটকের যে সকল সূত্র প্রকৃত প্রস্তাবে মন্ত্র নামের যোগ্য নহে সেই সমস্ত সূত্রও কালক্রমে পরিত্রাণ, ধারণী অথবা মন্ত্রৌষধরূপে পরিগণিত হইয়াছে, ত্রিপিটকে পাওয়া যায় না এরূপ অনেক জাতককথা, দেবারাধনা এবং ত্রিরতে�র স্তুতি ও মাহাত্ম্যপূর্ণ অনেক পরবর্তী রচনা বৌদ্ধ পরিত্রাণের সংখ্যা বর্দ্ধিত করিয়াছে, সঙ্গে সঙ্গে প্রচলিত হিন্দু বা আর্যভাবাপন্ন গৃহস্থের কর্ম-অকর্মের অনুকরণে কতকগুলি বাহ্যপ্রক্রিয়া এবং দেবদেবী পূজার্চ্চনা লৌকিক বৌদ্ধধর্মে স্থান পাইয়াছে। ফলে আমরা পরবর্তী পালি সাহিত্যে পরিত্ত-সঙ্গহ এবং বৌদ্ধসংস্কৃত গ্রন্থে অসংখ্য ধারণী-সংগ্রহ দেখিতে পাইতেছি। পালি অগ্গি-পরিত্ত বৌদ্ধ ধারণীমন্ত্রের একটি প্রকৃষ্ট উদাহরণ। চাকমা সমাজে প্রচলিত আগরতারাও একটি পরিত্রাণ-সংগ্রহ মাত্র। বৌদ্ধ সাহিত্যে পরিত্রাণ ও ধারণীর উদ্ভব ও প্রসারের সঙ্গে সঙ্গে মন্ত্রযান, বজ্রযান, কালচক্রযান প্রভৃতি তান্ত্রিক বৌদ্ধধর্মের উৎপত্তি হইয়াছে, প্রাচীন নীতিপ্রধান বৌদ্ধধর্ম একটি মন্ত্রবাদ, দেববাদ ও নামবাদে পর্যবসিত হইয়াছে, যত অঘটন ঘটিয়াছে। বস্তুত যেভাবে ক্রমে ক্রমে নীতিবাদ পশ্চাতে সরিয়া মন্ত্র-পাঠ প্রভৃতি তান্ত্রিকতা সম্মুখে আসিয়া সনাতন হিন্দু বা আর্য গৃহ্যধর্মের অনুরূপ একটি লৌকিক বৌদ্ধধর্ম সৃজন করিয়াছে তাহা প্রদর্শন করাই বৌদ্ধ ঐতিহাসিকের একটি প্রধান কর্তব্য। বাংলার যে সকল ঐতিহাসিক বলিতে চাহেন যে মনসার পূজা, শীতলার পূজা প্রভৃতি বৌদ্ধধর্ম হইতে উদ্ভূত হইয়াছে, তাঁহারা দেশের প্রকৃত ইতিহাস, নিজেদের জাতীয় প্রকৃতি এবং হিন্দু গৃহ্যধর্মের ক্রমবিকাশের ধারা আদৌ জানেন না। প্রচলিত হিন্দু গৃহ্যধর্মের সহিত রফারফি করিতে যাওয়ার ফলেই এত তন্ত্র-মন্ত্র, দেব-দেবীর পূজার্চ্চনা ও বিবিধ মিথ্যাদৃষ্টি বৌদ্ধ সাহিত্যে তথা লৌকিক বৌদ্ধধর্মে স্থান পাইয়াছে; চণ্ডী-পাঠ ও পরিত্রাণ-পাঠ আপাতদৃষ্টিতে সমান হইয়া পড়িয়াছে, অলক্ষিতে বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ শ্রমণবেশে ব্রাহ্মণ সাজিয়াছেন। নিুোদ্ধৃত অগ্গি-পরিত্তের কিয়দংশ পাঠ করিলে একথার উপলব্ধি হইবে।
জালো মহাজালো জালং মহাজালং জালিতে
মহাজালিতে জালিতং মহাজালিতং মুখে
মুখে সম্পত্তে মুখং মুখং সম্পত্তং সুতং গমিতি
সুতং গমিতি মিগয়ীতি মিগয়ীতি দিট্ঠালা
দন্তলা মড়লা রোকিলা করলা দুর্বালা
রিত্তি-রিত্তি লিত্তি-লিত্তি কিত্তি-কিত্তি
মিত্তি-মিত্তি বিত্তি-বিত্তি মুত্তি-মুত্তি বুত্তি-বুত্তি
ধারনি-ধারনীতি।













