পরচর্চা ও পরনিন্দা এক মানসিক ব্যাধি

0
139

মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম হলো হাসি-কান্না, আনন্দ -বেদনা, সুখ-দুঃখ, মান-অভিমান, হিংসা- বিদ্বেষ, পরনিন্দা-পরচর্চা, স্বার্থপরতা ও পরশ্রীকাতরতা। কিন্তু মানব তার মানবিকতা উন্মেষ ঘঠিয়ে নৈতিক চরিত্র গঠনের মাধ্যমে পরিশীলিত একটি সর্বজন প্রিয়তর জীবন গঠন করতে পারে । তজ্জন্য প্রকৃত সৎ শিক্ষা মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন করে থাকে। আধুনিক সভ্য সমাজে শিক্ষার প্রসারতা বেগমান হলেও উৎকৃষ্ট চিন্তাজগতে মানুষের ইতিবাচকতা পরিলক্ষিত তেমন হয় না।

ঝর্না বড়ুয়া

পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ জীব হলো মানুষ। বিচিত্র জগতে মানুষের বিচিত্র আচরণ। মানুষের মনের ভাব প্রকাশ করার অন্যতম মাধ্যম ভাষা। মানুষের এই ভাষার বহিঃপ্রকাশে আপনগুনে সহজ সরল সুমধুর, সুমিষ্টতা ও সুভাষণে অন্যের মনোজগত নিমিষের জয় করে নিতে পারে। আবার কঠিন কটুবাক্য, পিশুনবাক্য, কর্কশবাক্য ও মন্দবাক্যে অন্যের অন্তরে দুঃখ কষ্টের কারনও হতে পারে। মানুষের স্বভাবজাত ধর্ম হলো হাসি-কান্না, আনন্দ -বেদনা, সুখ-দুঃখ, মান-অভিমান, হিংসা- বিদ্বেষ, পরনিন্দা-পরচর্চা, স্বার্থপরতা ও পরশ্রীকাতরতা। কিন্তু মানব তার মানবিকতা উন্মেষ ঘটিয়ে নৈতিক চরিত্র গঠনের মাধ্যমে পরিশীলিত একটি সর্বজন প্রিয়তর জীবন গঠন করতে পারে। তজ্জন্য প্রকৃত সৎ শিক্ষা মানুষের ইতিবাচক পরিবর্তন করে থাকে। আধুনিক সভ্য সমাজে শিক্ষার প্রসারতা বেগমান হলেও উৎকৃষ্ট চিন্তাজগতে মানুষের ইতিবাচকতা পরিলক্ষিত তেমন হয় না। আমার সবাই সুখী হতে চাই আবার সুখের সংজ্ঞারও মতভেদে ভিন্নতা দেখা যায়। পাওয়ার সাথে চাওয়া মিললে আমরা সুখী ভাবলেও আপাতদৃষ্টিতে মানসিকভাবে সুখী মানুষের সংখ্যা খুবই কম । পরিবারে ভিন্নমত, আত্মীয়স্বজনের মধ্যে নানা বিবাদ, সমাজ ও রাষ্ট্রের মধ্যে নানারকম অসঙ্গতি, দ্বন্দ্ব, হিংসা, বৈষম্য, হারজিৎ, হীনমন্যতা, পরশ্রীকাতরতা, পরনিন্দা ও পরচর্চা এক মানসিক ব্যাধিতে পরিণত হয়েছে। মানুষের রন্ধ্রেরন্ধ্রে শিরা উপশিরায় এই পরনিন্দা ও পরচর্চা মহাব্যাধিতে আক্রান্ত । শিক্ষার গৌরব, ধনের গৌরব, সম্পত্তির গৌরব, বাড়ীগাড়ীর গৌরব, ক্ষমতার গৌরব, সন্তানের গৌরব, বংশের গৌরব সর্বোপরি অহংকারে নিজেদেরকে বড় দেখার মানসিকতায় অপরকে হেয় প্রতিপন্ন করার জন্য পরনিন্দা পরচর্চা চরমপর্যায়ে অর্থাৎ সর্বত্র অসম প্রতিযোগিতায় লিপ্ত । তাই রবি ঠাকুরের ভাষায়, “আমরা সবাই রাজা আমাদেরই রাজার রাজত্বে “।
সাধারণত অন্যকে নিয়ে মন্দ বা নিন্দা আলোচনা, দোষ বলা, হিংসাকাতর হওয়া এবং ইচ্ছাকৃতভাবে নেতিবাচক মনোভাব প্রকাশ করাই পরনিন্দা ও পরচর্চা। চর্চা শব্দটা উন্নত অর্থে বোঝায় যেমন সাহিত্য চর্চা, গবেষনা চর্চা, বিজ্ঞান চর্চা, প্রজ্ঞা চর্চা, দর্শন চর্চা ও সৃষ্টিশীল নানা প্রতিভার চর্চা যা দ্বারা মানুষের মনোজগতকে সমৃদ্ধ তথ্যবহুল যুক্তিসিদ্ধ প্রজ্ঞাবান ও সৃজনশীল হিসাবে গড়ে তুলে। চর্চা শব্দের আগে “পর” যোগ হয়ে শব্দের পুরো অর্থের ছন্দপতন ঘটায় যা দ্বারা মানুষের অন্তরজগত নেগেটিভ চিন্তা চেতনা দ্বারা প্রভাবিত হয়ে মনের শুদ্ধতা পবিত্রতা নষ্ট করে মনকে কালিমাযুক্ত করা হয়। মন্দ ভাবতে ভাবতে সর্বদা রাগচিত্ত ও হিংসার্ত্মক আচরনে অভ্যস্ত হয়ে মানুষের বুদ্ধিদীপ্ততা লোপ পায়। অনেক ক্ষেত্রে দেখা যায়, কারো সাথে মুখোমুখি সাক্ষাতে কতো আন্তরিক অভিবাদন, শ্রদ্ধা,  প্রশংসা, সম্প্রীতি ও গভীর বন্ধুত্বপূর্ণ আলাপচারিতা মনে প্রসন্নতাভাব আসে পরক্ষণে বিপরীতমুখী দৃষ্টিভঙ্গি নেতিবাচক আচরন গালমন্দ নিন্দা অন্যের দোষ খুঁজে বের করার রীতিমত কুঅভ্যাস হয়ে ধরা দিচ্ছে আমাদের সমাজ অঙ্গনে। এসব ধূর্ত ব্যক্তিদের পদচারণা ও লোকপ্রিয়তা কম নয়।আরো দেখা যায়, এই প্রক্রিয়ার যারা মুখরিত কোন আসরে অনুপস্থিত ব্যক্তিই হয়ে উঠে ঐদিনের আলোচিত অধ্যায় বা হিরো। এভাবে কেউ বাদ যাবার উপায় থাকে না কারন কোন না কোনদিন পালাক্রমে বা ব্যস্ততার কারনে অনুপস্থিত হলেই জুটবে নানা কুরুচিপূর্ণ তিক্ত আলোচনার মন্দ নিন্দাবাদ। এই যেন একই ব্যক্তির দ্বৈত আচরণ।মুখোমুখি মুগ্ধতা আর পেছনে তিক্ততা। এখানে একটা লোকনীতি কথা মনে পরলোঃ
অন্তরে অনিষ্ট চিন্তামুখে আত্মীয়তা,তার চেয়ে অনেক ভালোপ্রকাশ্যে শত্রুতা।পিছনে অনিষ্ট চিন্তাদেখা হলে মধুর বচন, এহেন কুমিত্রকে বিষকুম্ভ সম করিবে বর্জন।
যাহোক মন প্রতিটি কর্মের পুর্বগামী তাই দুষ্টমনে, মন্দমনে ও দোষযুক্ত মনে যে কোন কার্য সম্পাদন করলে দুঃখ কষ্ট লেগেই থাকে। আর অন্যদিকে মন যেহেতু কাজ করার আগে চিন্তা করে তাই সুন্দর মনে, সৎ বা ভালো মনে বা ন্যায়নীতি মনে যে কোন কাজ সম্পাদন করলে সুখ আনন্দ ছায়ার মতো অনুসরন করে। আমরা যদি প্রকৃত বন্ধু ও কল্যাণকামী হয়ে থাকি, অপরের সুখে সুখী এবং অপরের দুঃখে দুখী হওয়ার চেতনা, ভালোবাসা ও অন্তরে হিংসার পরিবর্তে প্রেম সৃষ্টি করতে পারি তাহলে আসল বা প্রকৃত সুখী হওয়া সম্ভব। মানুষ দোষ ত্রুটির উর্ধ্বে নয়। মানুষ তো আর শয়তান বা ফেরেশতা কেহই নন। তাই যে অন্যের দোষত্রুটি সংশোধন করে দেয় সেই প্রকৃত কল্যাণকামী বা প্রকৃত বন্ধু। বন্ধুর অধঃপতন দেখে আনন্দিত না হয়ে সমব্যতীত হওয়া, উন্নতিতে আনন্দ লাভ করা, কেউ নিন্দা করলে প্রতিবাদ করা এবং সুখ্যাতি করলে তাঁর প্রশংসা করা, ইহা প্রকৃত বন্ধু বা আত্মীয়ের পরিচয়। যারা নীতিবান ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তি নিজে নিজের আত্মসমালোচনা করে নিজের ভুলক্রটি বা দোষ খুঁজে তা সংশোধন করে নিজেকে আরো ব্যক্তিত্বসম্পন্ন মানবিক করে তোলে। কারন মানুষ তো সৃষ্টির সর্বশ্রেষ্ঠ জীব, বুদ্ধিদীপ্ত ও মানবিক। মানুষ একমাত্র পৃথিবীতে দাপিয়ে বেড়াই। এমন মানবের আচরন হবে উৎকৃষ্ট বা উত্তম, ভিতরে-বাইরে সমান নিরপেক্ষ। যেন বহুরূপী নিকৃষ্ট আচরনে সর্বশ্রেষ্ঠ মানবের গুনধর্মকে নিজেরাই দানবে পরিনত করছি।
মানুষের চিন্তার জগত ব্যাপক থেকে ব্যাপকতর। মানুষের ভাবনা হবে মহান, মহৎ, কল্যাণকর, সৎ, দূরদৃষ্টিসম্পন্ন, সম্ভাবনাময়, সৃষ্টিশীল, আধুনিক, বিজ্ঞানমনস্ক ও চিন্তাশীল। যা থেকে বর্তমান ও আগামী প্রজন্ম গ্রহন, ধারন, অনুশীলন করবে এবং নিজেদের অতিজাত করে গড়ে তুলবে। এককথায় বয়োজ্যেষ্ঠ্যদের অভিজ্ঞতা আর নতুনের তেজোদৃপ্ত শক্তিতে একুশ শতকে তৈরী হবে এক সম্ভাবনাময় আধুনিক বিজ্ঞানমনস্ক নতুন বিশ্ব। কোথাও কোন অভাব ও দুঃখ থাকবে না । সুখ, আনন্দ, সততা ও সম্প্রীতিসহ বিশ্বনাগরিকের শান্তির বিশ্ব।
উদাহরণস্বরূপ বলতে চাই, ভুটান দক্ষিণ এশিয়ার সবচেয়ে ক্ষুদ্রতম, পৃথিবীর ১৩৩তম দেশ, গভীর আরন্যিক আর চারিদিকে পাহাড়বেষ্টিত, আধুনিক ইন্ডাস্ট্রিবিহীন, নাগরিক সুযোগসুবিধা তেমন নেই বললেই চলে, সত্তর শতাংশ লোক কৃষিজীবী এবং রাজা শাসিত হয়েও কিভাবে প্রতিবছর সুখী মানুষের দেশের খেতাব বা সম্মান রক্ষা করে চলেছে যাগ্রস ন্যাশনাল হ্যাপীনেস (জিএনএইচ) নামে খ্যাত সর্বোপরি এশিয়ার সবচেয়ে সুখী দেশ। অর্থনৈতিক চাঙ্গা না হয়েও কিভাবে এই অশান্ত পৃথিবীতে শান্তি ও সুখের বার্তা নিজেদের দখলে রাখে তা রীতিমত চিন্তনীয় ও বিষ্ময়কর! সেই ভুটানের লোকেরা একজন অসুস্থ ব্যক্তিকে পরম মমতায় পরিবার,  প্রতিবেশী, সমাজ ও রাষ্ট্র সকল মিলেমিশে সেবা যত্ন আর ভালোবাসায় সুস্হ করে তোলে। তখন সবাই একসাথে সুখের ও তৃপ্তির আনন্দে মন খুলে হাসে। বিশ্ব মহামারী শুরুর পর থেকে ভুটানের রাজা নিজের বাড়িতে খুব কম সময় অবস্থান করেছেন। বেশিরভাগ সময় দেশের সুরক্ষা নিশ্চিতসহ সংক্রমণ ঠেকাতে সীমান্তে পাহারার স্বয়ং রাজা জিগমে খেসার নামগিয়েল ওয়াংচুক ও প্রধানমন্ত্রী লোটায় শেরিং একাধারে পাঁচদিন টহল দিয়েছেন। মাত্র ২ হাজার ১৩ জনের সংক্রমণ ধরা পড়েছে শুধুমাত্র একজনের মৃত্যু হয়েছে। ভারতীয় দর্শন শাস্ত্রে উল্লেখ আছে, রাজা ও জনগনের যদি দশটা গুন থাকে তারাই সর্বদা সুখী ও শান্তিতে বসবাস করতে পারেন। দশটা গুন হলোঃ ১. মানুষের সেবা করা ২. নৈতিক থাকা ৩. স্বার্থপরতা বর্জন করা ৪. সর্বদা সততা থাকা ৫. সৌম্য কোমলতা প্রদর্শন করা ৬. স্বনিয়ন্ত্রনকারী ৭. রাগচিত্ত মুক্ত ৮.উদারতাসহ হিংসা ত্যাগ করা ৯. সহনশীল ও ধৈর্য্যশীল হওয়া এবং ১০. নিরপেক্ষতা। এই গুনধর্মসমূহসহ রাজা ও প্রজাদের কঠোর পরিশ্রম, সততা ও ন্যায়পরায়ণতা ছোট্ট এই দেশকে বিশাল সম্মান ও মর্যাদা এনে দেয় প্রতিবছর। তদ্রুপ আমরা আপাতত রাষ্ট্রের কথা না ভেবে পরিবার, প্রতিবেশী, আত্মীয়স্বজন ও সমাজ ছোট্ট পরিসরে চলুন ইতিবাচক দৃষ্টি আর মানবিকতায় নিজেদের নতুন করে গড়ি তাতেই সুখী, সমৃদ্ধ ও আনন্দময় জগৎ সংসার তৈরী হবে। পরনিন্দা পরচর্চায় রত না থেকে আপন করনীয় কর্তব্য কর্ম সম্পাদন করি । কারো প্রাপ্তি বা প্রতিভাকে নিন্দা না করে ভালো দিকগুলো গ্রহন করি। হীনমন্যতায় প্রশংসা করতে না পারলেও অন্তত নিন্দা যেন না করি । মানবের সৎচিন্তা ও সৎবুদ্ধি দিয়ে উন্নত সৃষ্টিশীল মেধাবী প্রজন্ম তৈরি ও জাতি গঠন করা আমাদের সকলের কর্তব্য। অযথা সময় অচপয় না করে কোয়ালিটি এবং গঠনমূলক আলোচনায় আমরা নিজেদের শুদ্ধ ও ব্যক্তিত্বসম্পন্ন করে গড়ে তুলি। তাই আর নয় নিন্দা চর্চা আসুন আত্মসমালোচনা করে নিজেদেরকে আরো মানবিকসম্পন্ন করি। দানব না হয়ে মানব হই। তথাগত বুদ্ধের উপদেশে সার্বজনীনভাবেঅনুশীলন করার আদর্শ উপলব্ধি করা যায়” অপরের বিচ্যুতির প্রতি কিংবা কৃত বা অকৃত কাজের প্রতি লক্ষ্য করিবে না, নিজের কৃত বা অকৃত কাজের প্রতি সর্বদা দৃষ্টি রাখিবে”। –ধম্মপদ-৫০
অনন্ত প্রতি দিন একটি ভালো চিন্তা করুন, একটি ভালো কথা বলুন, একটি ভালো কাজ করুন দেখবেন একসময় সারাদিনেই আপনি ভালো চিন্তা, ভালো কথা, ভালো কাজেই করছেন। তখনিই জীবন হবে শুদ্ধ, সুন্দর, গৌরবান্বিত, অনুকরনীয়, সর্বজন প্রশংসনীয় আদর্শবান ও সকলের প্রিয় ব্যক্তিত্ব।শুভদৃষ্টি জাগ্রত হোক।বিশ্বে শান্তি আসুক।

জগতের সকল প্রানী সুখী হোক।

পরিচিতি: প্রাবন্ধিক ও প্রাক্তন এনজিও কর্মী, লং বীচ, ক্যালিফোর্নিয়া, আমেরিকা।

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here