প্রবন্ধ সাহিত্যে ‘বাংলা একাডেমী পুরস্কার’প্রাপ্ত আবুল মোমেন এর একান্ত সাক্ষাৎকার :

0
21

পুরস্কার প্রাপ্তিতে গুণী এ ব্যক্তিত্বের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আমার কথা হয়। সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় নগরীর প্রেস ক্লাবস্থ বাতিঘরের এক কোণে বসে নানা আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর আবেগ অনুভূতির কথা। শুধুমাত্র অনুভূতি প্রকাশ নয়, আবুল মোমেন কথা বলেছেন নানা বৈষম্যনীতি, সমকালীন শিক্ষা-সংস্কৃতির নানা দিক সম্পর্কে। বলেছেন সাম্রাজ্যবাদের কথা। সাম্প্রদায়িতকার বিষাক্ত ছোবলে এবং সমাজব্যবস্থায় নানা হতাশায় অভিযোগের তীর ছুটেছেন গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রতিও।

 
সাক্ষাৎকার গ্রহণ : শ্যামল চৌধুরী, সম্পাদক অমিতাভ

চট্টগ্রাম শহরেই জন্ম, বেড়ে ওঠা, শৈশব কাটানো আবুল মোমেন ১৯৪৮ সালের ১৮ ডিসেম্বর জন্মগ্রহণ করেন। পৈতৃক নিবাস দক্ষিণ চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায়। বাবা ছিলেন চট্টগ্রাম কলেজের অধ্যাপক। শহরের কাজীর দেউড়ীতে বাবার তৈরি বাড়ী ‘সাহিত্য নিকেতন’ এ বসবাস করে আসছেন। বাবার মতোই আবুল মোমেনও কর্মজীবন শুরু করেন অধ্যাপনা দিয়ে। প্রথমে একটি বেসরকারি কলেজে তিনি অধ্যাপনা করেন। পরে চট্টগ্রাম চারুকলা কলেজে। দীর্ঘ সময় তিনি ভাইস প্রিন্সিপালের দায়িত্ব পালন করেন। চারুকলা কলেজের ভারপ্রাপ্ত প্রিন্সিপালের দায়িত্বও পালন করেন। অধ্যাপনা করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সাংবাদিকতা বিভাগেও। সুদীর্ঘ ৫০ বছরের লেখালেখি জীবন তাঁর। আজ তিনি একাধারে কবি, প্রাবন্ধিক, সাহিত্যিক, সাংবাদিক ও বরেণ্য বুদ্ধিজীবি হিসেবে সমাদৃত। তার প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০টিরও অধিক। তন্মধ্যে রয়েছে কবিতা ৬টি, প্রবন্ধ ১৪টি, অনুবাদগ্রন্থ রয়েছে কয়েকটি, শিক্ষা নিয়ে রয়েছে ৪টি বই। গল্পেও তাঁর রয়েছে অসামান্য অবদান। শিশুসাহিত্য নিয়েও কাজ করেছেন। শিশুশিক্ষার সাথে তার পেরিয়েছে প্রায় ৪০ বছর। এছাড়াও সম-সাময়িক বিষয় নিয়ে লেখালেখির মাধ্যমে কলামিস্ট হিসেবে তিনি সুপরিচিত।  চট্টগ্রামের কৃতি সন্তান আবুল মোমেন এর সাফল্যের সর্বশেষ সংযোজন প্রবন্ধ সাহিত্যে অবদানের জন্য ‘বাংলা একাডেমি পুরস্কার-২০১৫’ প্রাপ্তি। পুরস্কার প্রাপ্তিতে গুণী এ ব্যক্তিত্বের সাথে নানা বিষয় নিয়ে আমার কথা হয়। সম্প্রতি এক সন্ধ্যায় নগরীর প্রেস ক্লাবস্থ বাতিঘরের এক কোণে বসে নানা আলাপচারিতায় উঠে আসে তাঁর আবেগ অনুভূতির কথা। শুধুমাত্র অনুভূতি প্রকাশ নয়, আবুল মোমেন কথা বলেছেন নানা বৈষম্যনীতি, সমকালীন শিক্ষা-সংস্কৃতির নানা দিক সম্পর্কে। বলেছেন সাম্রাজ্যবাদের কথা। সাম্প্রদায়িতকার বিষাক্ত ছোবলে এবং সমাজব্যবস্থায় নানা হতাশায় অভিযোগের তীর ছুটেছেন গণমাধ্যমের দায়িত্বশীল ভূমিকার প্রতিও। 


অমিতাভ : সমাজ সাহিত্য সংস্কৃতি বিষয়ক পত্রিকা ‘অমিতাভ’ এর পক্ষ থেকে আপনাকে জানাই অভিনন্দন। প্রাপ্তির আনন্দে ভালো আছেন নিশ্চয়ই। আজকে কিছু কথা আমরা শেয়ার করতে চাই, জানতে চাই আপনার এ পথ চলার দিগন্তবিস্তৃত ইতিহাস। আপনার সাফল্যের সর্বশেষ সংযোজন বাংলাদেশের সাহিত্য চর্চার ক্ষেত্রে সর্বোচ্চ স্বীকৃতি বাংলা একাডেমী পুরস্কার। এ প্রাপ্তিতে আপনার অনুভূতিটা কি রকম? 

আবুল মোমেন : সাধারণত পুরস্কার, স্বীকৃতি এগুলো নিয়ে আড়ম্বরতা থাকেই। তবে এটার দিকে আমি কখনো ওভাবে তাকাইনি। আমার কাজ আমি করে গেছি এবং আমি জানি যে, বহুবছর ধরে আমার নাম অনেকে পাঠায়, তো এটা নিয়ে আমি নিজে ভাবিনি। তবে পাওয়ার পরে আমি দেখছি- আমাকে যারা পছন্দ করে, ভালবাসে এ রকম লোকেরা খুব খুশী, তাদের খুশীতে আমি আনন্দিত বোধ করি, এটা তাদেরই পাওয়া। 

অমিতাভ : লেখালেখির অনুপ্রেরণা থেকেই সাংবাদিকতাকেই প্রধান পেশা হিসেবে নিয়েছেন। শুরুটা কখন থেকে?

আবুল মোমেন : আমি স্বাধীনতার পর পর চট্টগ্রামে ‘দৈনিক স্বাধীনতা’ নামে একটা কাগজ ছিল তাতে যুক্ত হই। এটা জামালখান থেকে আবদুল্লাহ আল হারুন চৌধুরী বের করতেন এবং সম্পাদক ছিলেন একুশের প্রথম কবিতার লেখক মাহবুবুল আলম চৌধুরী। আমি তখন ১৯৭১ সালের শেষের দিকে ডিসেম্বরে সহকারী সম্পাদক হিসেবে নিয়োগ দিই। ১৯৭২ সালের ফেব্রুয়ারির শেষেই আমি ঢাকা ইউনিভার্সিটিতে চলে আসি। প্রধান পেশা হিসেবে সাংবাদিতকতায় এসেছি চারুকলা কলেজ ছেড়ে ১৯৭৮ সালে। 
অমিতাভ : লেখালেখির শুরু এবং লেখালেখির ক্ষেত্রে আপনার আদর্শিক ব্যক্তিত্ব? 

আবুল মোমেন : স্কুল জীবন থেকেই লেখালেখি শুরু। আমাদের যেহেতু সাহিত্যিক পরিবার ছিল। আমার নানাও কথাসাহিত্যিক, আমার বাবা সাহিত্যিক, আমার মা লিখতেন, ঊনারও বই আছে। আমাদের বয়েসি মামা-খালারা খুব কাছাকাছি থাকতেন। সবমিলিয়ে একটা আসরের মতো ছিল। মূলতঃ পারিবারিক সূত্র ধরেই লেখালেখির অভ্যস্ততা।
অমিতাভ : বর্তমান প্রেক্ষাপটে চট্টগ্রামের লেখালেখি ও সাহিত্য চর্চার মূল্যায়ন?

আবুল মোমেন : বাংলাদেশটা একটা অনেকগুলো তৃতীয় বিশ্বের দেশের মতো। এটা ওয়ান সিটি কান্ট্রিতে (ড়হব পরঃু পড়ঁহঃৎু) পরিণত হয়েছে। অর্থাৎ এক নগরীর শহর। আমাদের সবকিছু ঢাকাকেন্দ্রিক হয়ে যাচ্ছে। সে কারণে যারা একটু ভালো লেখালেখি করে বা অন্যান্য ক্ষেত্রেও যাদের সম্ভাবনা ভালো- সেটা গানে হতে পারে, অভিনয়ে হতে পারে কিংবা অন্যকিছু। সকলেই চেষ্টা করে ঢাকায় থাকতে। কারণ ওখানে গেলে প্রতিষ্ঠিত হওয়া যায়, সহজেই পরিচিতি পাওয়া যায় এবং শেখাও যায়। এসব কারণে যেমন সম্প্রতি বাংলা একাডেমী পুরস্কারপ্রাপ্ত সুজন বড়ুয়া, সুব্রত বড়ুয়া, বিপ্রদাশ বড়ুয়া এর রকম অনেকেই আছেন যাঁরা ঢাকাতেই থেকে গেলেন। বাংলাদেশের জেলাশহরগুলো তাঁদের যোগ্যলোকদের ধরে রাখতে পারছেনা। একারণে চট্টগ্রামেরও শক্তিটা কমে গেছে আর কি। আগেকার দিনে প্রবীণ সাহিত্যিকরা নিজ নিজ শহরে বাস করতেন, প্রবীণ রাজনীতিবিদরা নিজ শহরে বাস করতেন। সৈয়দ নজরুল কিন্তু কিশোরগঞ্জেই বাস করতেন। জহুর আহমদ চৌধুরী, এম এ আজিজ কিন্তু চট্টগ্রামে বসবাস করেই জাতীয় নেতা। এখনতো আর সেটা হতে পারছে না। সকলকে ঢাকায় অবস্থান করতে হচ্ছে। ফলে আমরা যাঁদেরকে চট্টগ্রামের নেতা জানি তাঁরা কিন্তু ঢাকায় বসবাস করেন। আঞ্চলিক যাঁরা নেতৃত্ব দিচ্ছেন, তাঁরা ইলেকশনটা করতে আসেন, মাঝে মাঝে পার্টির কাজে চট্টগ্রাম আসেন। ডেইলি লাইফটা কিন্তু তাঁদের ঢাকায়। বাংলাদেশটা যেন এক নগরীর দেশ হয়ে গেছে। এটা একটা অসুবিধা। ফলে চট্টগ্রামেও ধরো যে বই মেলা হচ্ছে সেটা যে আঙ্গিকে বা যে মানে হওয়া উচিত ছিল, যে পরিমাণ প্রকাশক থাকা উচিত সেটা হচ্ছে না। 
অমিতাভ : তরুণ লেখক এবং তরুণদের উদ্দেশ্যে কিছু বলুন।

আবুল মোমেন : বর্তমানে যেটা হচ্ছে মানুষ কম প্রস্তুতি নিয়ে বই লিখছে। ভালো লেখার জন্য যে পড়াশোনা করা দরকার, সেটা কম হচ্ছে। প্রচুর বই বের হচ্ছে যেটা হওয়া উচিত নয়। সেজন্য আমি বলবো, আগে নিজের ভাষা আয়ত্ত করা দরকার। ভাল গদ্য, ভাল প্রকাশভঙ্গী এবং প্রচুর পড়া দরকার। অর্থাৎ বেশি করে সাহিত্য পড়া দরকার।
অমিতাভ : বর্তমান সমাজের কোন দিকটির উপর লেখকদের সমন্বিত গুরুত্বারোপ করা উচিত বলে আপনি মনে করেন?আবুল মোমেন : যদি বলা হয় সমন্বিত। তবে তাঁদেরকে একই প্লাটফরমে আসতে হবে। সাধারণত লেখকদের নিয়ে যদি কোন সংঘ বা রাইটার্স ক্লাব হয় তাহলেই সেটা সম্ভব। তবে এমনিতেই আবার লেখক-সাহিত্যিক এরা সাধারণ ইনডিভিজ্যুয়াল ব্যক্তি, তাঁদের প্রত্যেকের মতামত স্ট্রং থাকে, সে হিসেবে চলে। তবে সমাজ যেহেতেু অনেক রকম দাবি আমাদের সামনে নিয়ে আসে, সেগুলোর দিকে লেখকরা যেহেতু সংবেদনশীল মানুষ, সেজন্য এসব ব্যাপারে রোল প্লে করতে হয়। কারণ তাঁদের পক্ষের ভাষা দিয়ে সেটা প্রকাশ করা সম্ভব। মানুষের সাথে কম্যুনিকেট করা সম্ভব। যেমন ২০১২ সালে রামুতে যে ঘটনা ঘটলো, তখন লেখকদের একটা দায়িত্ব হতে পারে। তারা কিছু করেছে, কিছু করেনি। গণমাধ্যমগুলোর ভূমিকা ছিল প্রশ্নবিদ্ধ। 
অমিতাভ : রামু ঘটনায় কিন্তু চট্টগ্রামের তুলনায় ঢাকার পত্রিকাগুলো দায়িত্বশীল ভূমিকা রেখেছে বেশি? এ বিষয়ে আপনি কি একমত?

আবুল মোমেন : একেবারেই একমত। চট্টগ্রামের পত্রিকাগুলো চট্টগ্রামের সমাজজীবনে, চট্টগ্রামের সাংস্কৃতিক জীবনে যথাযথ ভূমিকা পালন করতে পারছে না, অভিযোগ করেই বলতে পারি। কারণ এ কাজগুলোকে গণমাধ্যমের পৃষ্ঠপোষকতা বা সহযোগিতা ছাড়া উঠে আসতে পারবে না। কিন্তু তারা দায়িত্বটা সঠিকভাবে পালন করতে পারছে না। 

অমিতাভ : বর্তমান সমাজব্যবস্থা, শিক্ষার মান ও সংস্কৃতি চর্চা সম্পর্কে আপনার বক্তব্য? 

আবুল মোমেন : শিক্ষা নিয়ে আমি কাজ করছি ৪০ বছর ধরে। শিক্ষা নিয়েই আমার ৪টি বইও প্রকাশিত হয়েছে। আমি হতাশার দিক দেখি যে, আমরা পরিমাণগতভাবে, সংখ্যাগত দিক থেকে একটা উন্নতি হয়েছে। যেখানে প্রায় ৯৭% ছাত্র প্রাইমারীতে এনরোল হয়। ঝড়ে পড়ার হারটা একটু বেশি। শতকরা ২০ ভাগ প্রাইমারী শেষ করতে পারে না। কতগুলো বড় দুর্বলতা হচ্ছে আমাদের পরীক্ষাকেন্দ্রিক লেখাপড়া হয়। পরীক্ষাকেন্দ্রিক লেখাপড়াতে ছাত্রদের আসলে শিক্ষানীতিতে হয় না। পরীক্ষার পড়াটা হচ্ছে খন্ডিত। সে শুধু প্রশ্নের উত্তরটা মুখস্ত করে। যে জিনিসটা পরীক্ষার জন্য প্রয়োজনীয় নয়, সে জিনিসটা ছাত্ররা পড়বে না। কারণ তার জীবনের একমাত্র লক্ষ্য এ প্লাস পাওয়া। এটাতো শিক্ষার লক্ষ্য হতে পারে না। ফলে শিক্ষাটা নষ্ট হচ্ছে। শিক্ষার মান পড়ে যাচ্ছে। আমরা এম.এ পাশ ছাত্রদেরকে দেখি তারা মনের ভাব প্রকাশ করে নিজের মাতৃভাষা লিখতে পারে না, একটা দরখাস্ত লিখতে পারে না। তো এ শিক্ষার অর্থটা কি, কাজে লাগাতে পারছি না? সেজন্য বড় রকমের মৌলিক সংস্কার প্রয়োজন। 
অমিতাভ : শিক্ষা ব্যবস্থার এ অনগ্রসরতার কারণে সংস্কৃতি চর্চার ক্ষেত্রে অন্তরায় কি? 

আবুল মোমেন : হ্যাঁ অবশ্যই। সংস্কৃতি চর্চার জন্য শিক্ষা তো লাগবেই। মানুষের সংস্কৃতির মূল অবলম্বন হচ্ছে ভাষা, তার মাতৃভাষা। আপনি গান করলেও মাতৃভাষা লাগছে, কবিতা লিখলেও মাতৃভাষা লাগছে কিংবা নাটক করলেও মাতৃভাষা লাগছে। ফলে ভাষাই যদি সঠিকভাবে শেখা না হয়, তাহলে সংস্কৃতিচর্চায় ঘাটতি-দূর্বলতা থেকে যাবে।  
অমিতাভ : আপনি দেশের একজন বরেণ্য বুদ্ধিজীবি। আপনার কলমে ওঠে আসে অসাম্প্রদায়িকতা ও সাম্রাজ্যবাদের কথা। বর্তমান বাংলাদেশের মূল্যায়ন এবং ভবিষ্যতে কেমন বাংলাদেশ আপনি দেখতে চান?

আবুল মোমেন : এ মুহূর্তে তো দীর্ঘ ভবিষ্যতের কথা বলা যাবে না। বাংলাদেশে অনেকগুলো সংকট আছে। আমাদের সমাজটা নানাভাবে বিভক্ত সমাজ। এটা কেবল রাজনৈতিকভাবে বিভক্ত তা নয়। ধনী-দরিদ্রের বৈষম্য বাড়ছে, সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ছে, মানুষের চিন্তা-চেতনার ক্ষেত্রে বৈষম্য বাড়ছে। আমাদের যেহেতু স্কুল শিক্ষাটা তিনটা মূলধারায় চলছে- ইংরেজি মাধ্যম, বাংলা মাধ্যম এবং মাদ্রাসা। তার বাইরেও বিভিন্ন লেভেলে চলছে।যেমন ক্যাডেট কলেজে একজন ছাত্রের পেছনে সরকারের বার্ষিক ব্যয় হচ্ছে ৭৫,০০০ টাকা। আর বেসরকারি স্কুলে একজন ছাত্রের জন্য সরকারের ব্যয় মাত্র ১,৫০০ টাকা। ফলে আমি যদি মনে করি একজন ছাত্রকে মানসম্পন্ন শিক্ষা দিতে ৭৫,০০০ টাকা লাগে, তাহলে আমি বিশ্বাস করি না যে ১,৫০০ টাকা দিয়ে তা সম্ভব। তাহলে আমি কেন করছি? বৈষম্যটা বিরাট। একটা হচ্ছে তার কারিকুলামের কারণে চিন্তা-ভাবনার মধ্যে বৈষম্য হচ্ছে, আরেকটা হচ্ছে তার সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে বৈষম্য। ফলে তার যে দক্ষতা অর্জিত হবে সেক্ষেত্রে বৈষম্য থেকে যাচ্ছে। আরেকটা হচ্ছে, আমাদের শিক্ষাটা যেহেতু মুখস্তবিদ্যা নির্ভর, সেজন্য কেউ মৌলিক চিন্তা করতে পারে না। মৌলিক চিন্তা হচ্ছে নিজের মতো করে ভাবা, সেটা না পারলে মানুষে প্রত্যেকে প্রত্যেকের মতোই মৌলিক…সেটা হচ্ছে না। কাজেই শিক্ষাতো গাইডলাইন দিচ্ছে না। আমাকে শিক্ষাকে গুরুত্ব দিতে হবে। তাহলেই আমরা একটা ডিরেকশনে যেতে পারবো।  শিক্ষা ব্যবস্থাকে ঢেলে সাজাতে হবে, একেবারে মৌলিক পরিবর্তন দরকার।  
অমিতাভ : চট্টগ্রাম থেকে প্রকাশিত সাহিত্য পত্রিকা বা লিটল ম্যাগাজিন সম্পর্কে আপনার মূল্যায়ন?

আবুল মোমেন : চট্টগ্রামে কিছু লিটল ম্যাগাজিন হচ্ছে। তবে সাহিত্য পত্রিকা আমার চোখে পড়েনি। তবে যে কয়টি লিটল ম্যাগাজিন বের হয় তাও অনিয়মিত। আর সাহিত্য পত্রিকা হলে নিয়মিত হতে হবে। মাসিক কিংবা ত্রৈমাসিক। এটার জন্য আর্থিক সংকটও অন্যতম কারণ। তাছাড়া সৃষ্টিশীলতা তো কোন নিয়ম বেঁধে হবে না। 
অমিতাভ : চট্টগ্রামে আপনারই গড়া শিক্ষা ও সংস্কৃতিচর্চা কেন্দ্র ‘ফুলকি’ সম্পর্কে কিছু বলুন। আপনার ভবিষ্যত পরিকল্পনা কি আমাদের জানাবেন?

আবুল মোমেন : আমি শুরু করেছিলাম ১৯৭৫ এর বঙ্গবন্ধু পরিবারের হত্যাকান্ডের পরে। যখন পরিস্থিতিটা দম বন্ধ হওয়ার মতো। তখন বাচ্চাদের নিয়ে সময় কাটালে মন ভালো থাকবে সে হিসেবে শুরু করা। পরে এটা আমাকে নিয়ে গেল শিশুশিক্ষার দিকে। বিষয়টা নিয়ে অনেক কাজ করার একটা দায়বোধের কারণে শিশুদের স্কুল চালু করি। শিশুশিক্ষা কেমন হওয়া উচিত? আমাদের মূলকথা হচ্ছে শিক্ষা এবং সংস্কৃতি হাত ধরাধরি করে চলতে হবে। এটা একে অপরের পরিপূরক। এই জিনিসটা আমরা উদ্যোগ নিয়েছি। এখন নানা জেলায় দেশের বিভিন্ন স্কুলে আমরা কাজ করছি। শিক্ষানীতিতেও আমাদের অনেক চিন্তা-ভাবনাকে গ্রহণ করা হয়েছে। এখন সরকারও চাচ্ছে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডকে আরো বাড়াতে। 
অমিতাভ : চট্টগ্রামে বিচ্ছিন্নভাবে বইমেলা অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এ ব্যাপারে আপনার মন্তব্য কি? 

আবুল মোমেন : আমি এটা একদম পছন্দ করছি না। এভাবে অপ্রস্তুত, অপরিকল্পিত, দায়সারা গোছের কাজ আমি পছন্দ করি না। তাতে করে বইয়ের প্রতি ভালবাসা, বইমেলা সম্পর্কে ধারণা এর কোনটাই ঠিকমতো হচ্ছে না। এভাবে এলোমেলো, বই বিক্রি তো নয়, লোক জড়ো করতে সর্বক্ষণ মাইকের আওয়াজ…! বইমেলা হবে একটা নিরিবিলি পরিবেশে। যে নিজের মতো বইটা দেখতে পারে। মূখ্য ব্যাপার হওয়া উচিত বই বিক্রি, বই প্রকাশকরা যাতে থাকে। ঢাকার প্রকাশকদেরও আনতে হবে। একটা সম্মিলিত প্রয়াসের মাধ্যমে একটা বইমেলা হওয়া উচিত এবং সেটা প্রকৃত বইমেলা হওয়া উচিত। এখন যেটা হচ্ছে সেটা চট্টগ্রামের জন্য খারাপ হচ্ছে, চট্টগ্রাম সম্পর্কে ধারণা খারাপ হচ্ছে। 
অমিতাভ : আপনাকে অশেষ ধন্যবাদ ও কৃতজ্ঞতা অমিতাভ পরিবারের পক্ষ থেকে আপনার মূল্যবান সময় দেওয়ার জন্য।আবুল মোমেন : অমিতাভ সংশ্লিষ্ট সবাইকে আমার শুভ কামনা থাকলো। 

সহযোগিতায় : ইমন বড়ুয়া, ছবি : সৌমেন বড়ুয়া 

LEAVE A REPLY

Please enter your comment!
Please enter your name here